Namer Ortho Bangla
নামাজ 30 November 2025

শবে কদর নামাজ: নিয়ম, নিয়ত ও ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত

শবে কদর, যা লাইলাতুল কদর নামেও পরিচিত, মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত। এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির পথপ্রদর্শক পবিত্র কুরআন নাজিল করেন। শবে কদরের রাতে ইবাদত করা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। তাই এই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাটানো উচিত। শবে কদরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নফল নামাজ আদায় করা।

শবে কদর কি?

শবে কদর আরবি শব্দ। ‘শব’ মানে রাত আর ‘কদর’ মানে সম্মান, মর্যাদা, মহিমা। সুতরাং শবে কদরের অর্থ হলো মহিমান্বিত রাত বা মর্যাদাপূর্ণ রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য সর্বশেষ আসমানি কিতাব কুরআনুল কারিম নাজিল করেছেন। তাই এই রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক বেশি।

শবে কদরের তাৎপর্য

শবে কদরের তাৎপর্য অপরিসীম। এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লাইলাতুল কদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর’ অর্থাৎ ‘শবে কদর হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম।’ (সূরা আল-কদর, আয়াত: ৩)। এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং ইবাদতকারীদের জন্য দোয়া করেন। শবে কদরের রাতে মুমিন বান্দাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং তাদের দোয়া কবুল করা হয়।

শবে কদর কবে?

শবে কদর রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি। নির্দিষ্ট করে তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। তবে, অধিকাংশের মতে রমজানের ২৭তম রাতেই শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর তালাশ করো।’ (বুখারি ও মুসলিম)

শবে কদরের নামাজের নিয়ম

শবে কদরের রাতে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ নেই। তবে, নফল নামাজ আদায় করা এই রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নিজের সাধ্য অনুযায়ী যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ পড়া যায়। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজের নিয়ম আলোচনা করা হলো:

সালাতুল তাসবিহ

সালাতুল তাসবিহ একটি বিশেষ নামাজ। এই নামাজে আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা হয়। সালাতুল তাসবিহ পড়ার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:

  • প্রথমে নিয়ত করতে হবে: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সালাতুল তাসবিহ চার রাকাত নামাজ আদায় করছি।”
  • তারপর তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজ শুরু করতে হবে।
  • সূরা ফাতিহা পড়ার পর যেকোনো একটি সূরা মিলিয়ে ১৫ বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে।
  • এরপর রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবিহ পড়ার পর ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  • রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  • সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পড়ার পর ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  • সিজদা থেকে উঠে বসে ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  • আবার সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পড়ার পর ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  • এভাবে প্রতি রাকাতে ৭৫ বার তাসবিহ পড়তে হবে।
  • চার রাকাত নামাজ একই নিয়মে আদায় করতে হবে।

নফল নামাজ

শবে কদরের রাতে যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ আদায় করা উচিত। দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়া যায়। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে যেকোনো সূরা মিলিয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন।

তাহাজ্জুদের নামাজ

তাহাজ্জুদের নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাতের শেষভাগে ঘুম থেকে উঠে এই নামাজ আদায় করতে হয়। কমপক্ষে দুই রাকাত এবং সর্বোচ্চ ১২ রাকাত পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া যায়।

শবে কদরের নামাজের নিয়ত

শবে কদরের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ত নেই। সাধারণ নফল নামাজের মতোই নিয়ত করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ:

বাংলা নিয়ত: আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি।

আরবি নিয়ত: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাতাইনি সালাতান নাফলি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।

শবে কদরের দোয়া

শবে কদরের রাতে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। দোয়াটি হলো:

আরবি দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করুন।

এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা উচিত। এছাড়াও নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো দোয়া করা যায়।

শবে কদরের ফজিলত

শবে কদরের ফজিলত অনেক। এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাদের দোয়া কবুল করেন। শবে কদরের রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং ইবাদতকারীদের জন্য দোয়া করেন। তাই এই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান।

শবে কদরের করণীয়

শবে কদরের রাতে কিছু বিশেষ আমল করা উচিত। নিচে কিছু করণীয় উল্লেখ করা হলো:

  • বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা।
  • কুরআন তেলাওয়াত করা।
  • জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা।
  • দোয়া ও ইস্তেগফার করা।
  • গরীব ও অসহায়দের দান করা।
  • নিজের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
  • পরস্পরের জন্য কল্যাণ কামনা করা।

শবে কদরের বর্জনীয়

শবে কদরের রাতে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। নিচে কিছু বর্জনীয় বিষয় উল্লেখ করা হলো:

  • অহেতুক কথাবার্তা ও কাজ থেকে বিরত থাকা।
  • গীবত ও পরনিন্দা করা থেকে বিরত থাকা।
  • হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করা।
  • বেহুদা কাজে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা।
  • গান বাজনা ও অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে থাকা।

উপসংহার

শবে কদর মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ রহমত। এই রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত উপলব্ধি করে বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শবে কদরের রাতে সঠিকভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের গুনাহ মাফ করে দিন। আমিন।