এশার নামাজ কয় রাকাত সুন্নত ও ফরজ – বিস্তারিত জেনেনিন
সূচিপত্র
এশার নামাজ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। প্রতিদিনকার ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় আমরা নামাজের রাকাত সংখ্যা বা নিয়মকানুন নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। তাই, এশার নামাজ কয় রাকাত সুন্নত ও কয় রাকাত ফরজ, তা সঠিকভাবে জানা থাকা দরকার। এই আর্টিকেলে আমরা এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা, সুন্নত ও ফরজের নিয়ম এবং এই সম্পর্কিত কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা
এশার নামাজ মোট ১৭ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নত, ৪ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নত, ২ রাকাত নফল এবং ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব। নিচে রাকাতগুলোর বিভাজন দেওয়া হলো:
- প্রথম ৪ রাকাত সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদা)
- পরের ৪ রাকাত ফরজ
- তারপর ২ রাকাত সুন্নত (মুয়াক্কাদা)
- এরপর ২ রাকাত নফল
- সবশেষে ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব
এশার নামাজের নিয়মাবলী
এশার নামাজ অন্যান্য নামাজের মতোই আদায় করতে হয়, তবে রাকাত সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। নিচে প্রতিটি ধাপের নিয়মাবলী আলোচনা করা হলো:
প্রথম ৪ রাকাত সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদা)
এই ৪ রাকাত সুন্নত নামাজ সাধারণ সুন্নতের মতোই আদায় করতে হয়।
- প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় নিয়ত করতে হবে।
- তারপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরিমা বাঁধা।
- এরপর ছানা পড়া (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…)
- সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- রুকুতে যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া (সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম)।
- সিজদায় যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া (সুবহানা রাব্বিয়াল আলা)।
- প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় রাকাত আদায় করা।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ পড়া।
- দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- রুকু ও সিজদা করে চতুর্থ রাকাত আদায় করা।
- চতুর্থ রাকাতে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো।
৪ রাকাত ফরজ
এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ অন্যান্য ফরজ নামাজের মতোই আদায় করতে হয়।
- দাঁড়িয়ে নিয়ত করা।
- ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরিমা বাঁধা।
- ছানা পড়া।
- সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- রুকুতে যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- সিজদায় যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় রাকাত আদায় করা।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ পড়া।
- দাঁড়িয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত আদায় করা (এই দুই রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়তে হয়, অন্য কোনো সূরা মিলানো লাগে না)।
- চতুর্থ রাকাতে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো।
২ রাকাত সুন্নত (মুয়াক্কাদা)
এশার ২ রাকাত সুন্নত নামাজ অন্যান্য সুন্নতের মতোই আদায় করতে হয়।
- দাঁড়িয়ে নিয়ত করা।
- ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরিমা বাঁধা।
- ছানা পড়া।
- সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- রুকুতে যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- সিজদায় যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় রাকাত আদায় করা।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো।
২ রাকাত নফল
নফল নামাজ সাধারণত অতিরিক্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি পড়া আবশ্যক নয়, তবে পড়লে সাওয়াব পাওয়া যায়। নফল নামাজ অন্যান্য সাধারণ নামাজের মতোই আদায় করতে হয়।
৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব
বিতর নামাজ এশার নামাজের শেষ অংশ এবং এটি ওয়াজিব। বিতর নামাজের নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- দাঁড়িয়ে নিয়ত করা।
- ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরিমা বাঁধা।
- ছানা পড়া।
- সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় রাকাত আদায় করা।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ পড়া।
- দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য সূরা ফাতিহা পড়া এবং অন্য একটি সূরা মিলানো।
- সূরা মিলানোর পর অতিরিক্ত তাকবীর বলা (আল্লাহু আকবার)।
- তাকবীরের পর কুনুতের দোয়া পড়া।
- রুকুতে যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- সিজদায় যাওয়া এবং তাসবিহ পড়া।
- তৃতীয় রাকাতে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো।
কুনুত দোয়া
বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে রুকুর আগে কুনুত দোয়া পড়তে হয়। কুনুত দোয়া নিচে দেওয়া হলো:
আরবি: اللَّهُمَّ إنا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ كُلَّهُ نَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা ওয়া নাসতাগফিরুকা, ওয়া নু’মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইরা কুল্লাহু, নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাইঁ ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া লাকা নুসল্লী ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাস’আ ওয়া নাহফিদু, নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা, ইন্না আজাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক্।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা তোমার সাহায্য চাই, তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তোমার প্রতি ঈমান আনি এবং তোমার উপর ভরসা করি। আমরা তোমার সব কল্যাণের প্রশংসা করি, তোমার কৃতজ্ঞতা জানাই এবং অকৃতজ্ঞ হই না। আমরা পরিত্যাগ করি এবং সম্পর্ক ছিন্ন করি তাদের সাথে, যারা তোমার অবাধ্য হয়। হে আল্লাহ! আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমার জন্য নামাজ পড়ি এবং তোমাকেই সিজদা করি। আমরা তোমার দিকে ধাবিত হই এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য চেষ্টা করি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি এবং তোমার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার শাস্তি কাফেরদের জন্য নির্ধারিত।
এশার নামাজের গুরুত্ব
এশার নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে এর ফজিলত উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত এশার নামাজ আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
কিছু জরুরি বিষয়
- যদি কেউ সুন্নত নামাজ পড়তে না পারে, তবে শুধু ফরজ ও বিতর নামাজ আদায় করলেও চলবে।
- তবে সুন্নত নামাজ আদায় করা উত্তম, কারণ এতে অনেক সওয়াব রয়েছে।
- কুনুত দোয়া মুখস্থ না থাকলে অন্য যেকোনো দোয়া পড়া যেতে পারে অথবা শুধু ‘আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার’ পড়লেও চলবে।
উপসংহার
এশার নামাজ মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই নামাজে ১৭ রাকাত রয়েছে, যার মধ্যে সুন্নত, ফরজ, নফল ও বিতর ওয়াজিব অন্তর্ভুক্ত। সঠিক নিয়ম ও মনোযোগের সাথে নামাজ আদায় করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনাদের এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা ও নিয়মাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছে।